এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন | এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া
বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী এসব শিক্ষক-কর্মচারী মাসিক বেতন, বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। অনেক শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ এখনো জানতে চান এমপিওভুক্ত অর্থ কী, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কত, বাড়ি ভাড়া কীভাবে নির্ধারিত হয় এবং উচ্চতর স্কেল পাওয়ার নিয়ম কী। এই আর্টিকেলে সব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর তুলে ধরা হলো।
এমপিওভুক্ত অর্থ কি
এমপিও (MPO) এর পূর্ণরূপ হলো Monthly Pay Order।
যেসব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সরকার মাসিকভাবে বহন করে, তাদের এমপিওভুক্ত শিক্ষক বলা হয়। সহজভাবে বললে এমপিওভুক্ত অর্থ হলো সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদিত বেতন সুবিধা, যা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে শিক্ষকরা নিয়মিত পান।
এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষকরা সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতন ও ভাতা পেয়ে থাকেন, যদিও তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উচ্চতর স্কেল
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন মূলত জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। শিক্ষকের পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বেতন ভিন্ন হয়ে থাকে।
সাধারণ বেতন কাঠামো (সংক্ষেপে)
প্রভাষক (Lecturer): জাতীয় বেতন স্কেলের ৯ম গ্রেড
সহকারী শিক্ষক (মাধ্যমিক): সাধারণত ১০ম বা ১১তম গ্রেড
প্রধান শিক্ষক: ৮ম বা তার ঊর্ধ্বতন গ্রেড
মাদ্রাসা শিক্ষক: পদভেদে সমমানের গ্রেড
প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়ে মূল বেতন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
উচ্চতর স্কেল পাওয়ার শর্ত
নির্ধারিত সময় একই পদে চাকরি করা
সন্তোষজনক চাকরি রেকর্ড
প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা
কর্তৃপক্ষের অনুমোদন
উচ্চতর স্কেলের সুবিধা
মূল বেতন বৃদ্ধি
ভবিষ্যৎ পেনশন ও গ্র্যাচুইটির পরিমাণ বৃদ্ধি
আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া
উচ্চতর স্কেল সাধারণত একাধিক ধাপে প্রদান করা হয়।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন সরকার নির্ধারিত জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী প্রদান করা হয়। শিক্ষকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হলেও তাদের মূল বেতন ও ভাতা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া হয়।
পদভেদে বেতন গ্রেড
প্রভাষক (কলেজ): ৯ম গ্রেড
সহকারী শিক্ষক (মাধ্যমিক): ১০ম বা ১১তম গ্রেড
প্রধান শিক্ষক: ৮ম গ্রেড বা তার ঊর্ধ্বে
মাদ্রাসা শিক্ষক: সমমানের গ্রেড অনুযায়ী
বেতনের অন্তর্ভুক্ত ভাতা
মূল বেতন
বাড়ি ভাড়া (৩০%–৫০%)
চিকিৎসা ভাতা
উৎসব ভাতা
বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন কত
এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন সরকার নির্ধারিত জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী দেওয়া হয়। পদ ও যোগ্যতা ভেদে বেতন আলাদা হয়।
ইবতেদায়ী শিক্ষক: সাধারণত ১১তম গ্রেড
মূল বেতন প্রায় ১২,৫০০ টাকা থেকে শুরুদাখিল সহকারী শিক্ষক: ১০ম গ্রেড
মূল বেতন প্রায় ১৬,০০০ টাকাদাখিল সিনিয়র শিক্ষক: ৯ম গ্রেড
মূল বেতন প্রায় ২২,০০০ টাকাআলিম প্রভাষক: ৯ম গ্রেড
মূল বেতন প্রায় ২২,০০০ টাকামাদ্রাসা সুপার / অধ্যক্ষ: ৮ম গ্রেড
মূল বেতন প্রায় ২৩,০০০–২৯,০০০ টাকা
বাড়ি ভাড়া ও ভাতা
বাড়ি ভাড়া: মূল বেতনের ৩০%–৫০%
চিকিৎসা ভাতা
উৎসব ভাতা
বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
সব মিলিয়ে একজন এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকের মাসিক মোট বেতন ১৮,০০০ টাকা থেকে ৪০,০০০+ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
এমপিওভুক্ত কলেজের অধ্যক্ষের বেতন কত
এমপিওভুক্ত কলেজের অধ্যক্ষের বেতন সরকার নির্ধারিত জাতীয় বেতন স্কেল (৮ম গ্রেড) অনুযায়ী দেওয়া হয়।
গ্রেড: ৮ম
মূল বেতন (শুরুর দিকে): প্রায় ২৩,০০০ টাকা
সর্বোচ্চ মূল বেতন (ইনক্রিমেন্টসহ): প্রায় ৫৫,৪৭০ টাকা
ভাতা যোগ হলে
বাড়ি ভাড়া: মহানগরে মূল বেতনের ৫০% (শহর/গ্রামে কম)
চিকিৎসা ভাতা
উৎসব ভাতা
বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
সব মিলিয়ে একজন এমপিওভুক্ত কলেজ অধ্যক্ষের মাসিক মোট বেতন সাধারণত ৩৫,০০০ টাকা থেকে ৭০,০০০+ টাকা হতে পারে—অভিজ্ঞতা ও অবস্থানভেদে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ভাতা কত
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ভাতা নির্দিষ্ট কোনো এক অঙ্কে নাই এটা নির্ভর করে শেষ মূল বেতন, চাকরির মেয়াদ ও সরকারি নিয়মের ওপর। নিচে সহজ করে বোঝাচ্ছি।
১. মাসিক পেনশন
অবসরের সময়কার শেষ মূল বেতনের প্রায় ৫০%
আজীবন মাসিকভাবে প্রদান করা হয়
শিক্ষক মারা গেলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরিবার পায়
👉 উদাহরণ:
শেষ মূল বেতন যদি ৩০,০০০ টাকা হয়
➡ মাসিক পেনশন প্রায় ১৫,০০০ টাকা
২. গ্র্যাচুইটি (এককালীন টাকা)
সাধারণত ৮–১২ লাখ টাকা
চাকরির মেয়াদ ও শেষ বেতনের ওপর নির্ভরশীল
একবারেই প্রদান করা হয়
৩. কল্যাণ ট্রাস্ট সুবিধা
অবসরের পর এককালীন ৫০,০০০–১,০০,০০০ টাকা (পরিবর্তনশীল)
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ঈদ বোনাস
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ঈদ বোনাস সরকার নির্ধারিত নিয়মে প্রদান করা হয়। সংক্ষেপে ও পরিষ্কারভাবে নিচে দেওয়া হলো
ঈদ বোনাস কত
পরিমাণ: মূল বেতনের ৫০%
বছরে কয়বার: সাধারণত ২ বার
ঈদুল ফিতর
ঈদুল আজহা
👉 অর্থাৎ, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক বছরে মোট ১টি পূর্ণ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ঈদ বোনাস পান।
উদাহরণ
যদি কোনো শিক্ষকের মূল বেতন ২০,০০০ টাকা হয়
ঈদুল ফিতরে বোনাস: ১০,০০০ টাকা
ঈদুল আজহায় বোনাস: ১০,০০০ টাকা
বছরে মোট ঈদ বোনাস: ২০,০০০ টাকা
কারা পাবেন
এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা
যাদের এমপিও অনুমোদন সক্রিয় আছে
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ঈদ বোনাস মূল বেতনের ওপর হিসাব হয়
বাড়ি ভাড়া বা অন্যান্য ভাতা যোগ হয় না
সাধারণত ঈদের আগে বোনাস পরিশোধ করা হয়
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রদান করা হয়। সাধারণভাবে এটি ঈদ উপলক্ষে দেওয়া হয় এবং একে অনেক সময় ঈদ বোনাসও বলা হয়।
পরিমাণ: মূল বেতনের ৫০%
বছরে: সাধারণত ২ বার
ঈদুল ফিতর
ঈদুল আজহা
👉 অর্থাৎ, বছরে মোট উৎসব ভাতা = মূল বেতনের ১০০%
কীভাবে হিসাব করা হয়
শুধু মূল বেতন ধরা হয়
বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বা অন্যান্য ভাতা যোগ হয় না
উদাহরণ
মূল বেতন যদি ১৮,০০০ টাকা হয়
প্রতি ঈদে উৎসব ভাতা: ৯,০০০ টাকা
বছরে মোট উৎসব ভাতা: ১৮,০০০ টাকা
কারা উৎসব ভাতা পান
এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক
এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাও (পদভেদে)
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
উৎসব ভাতা সাধারণত ঈদের আগে প্রদান করা হয়
এমপিও স্থগিত থাকলে উৎসব ভাতা পাওয়া যায় না
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী হার পরিবর্তন হতে পারে
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ভাতা সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মূল বেতনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে দেওয়া হয়। নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো
বাড়ি ভাড়ার হার
এলাকা ভেদে বাড়ি ভাড়া নির্ধারিত হয়
মহানগর এলাকা: মূল বেতনের ৫০%
শহর এলাকা: মূল বেতনের ৪০%
গ্রামাঞ্চল: মূল বেতনের ৩০%
কীভাবে হিসাব করা হয়
বাড়ি ভাড়া শুধু মূল বেতনের ওপর হিসাব হয়
উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা বা অন্যান্য ভাতা এতে যুক্ত হয় না
উদাহরণ
মূল বেতন যদি ২০,০০০ টাকা হয়
মহানগরে বাড়ি ভাড়া: ১০,০০০ টাকা
শহরে বাড়ি ভাড়া: ৮,০০০ টাকা
গ্রামে বাড়ি ভাড়া: ৬,০০০ টাকা
কারা বাড়ি ভাড়া পান
এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা
এমপিও অনুমোদন সক্রিয় থাকতে হবে
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
বাড়ি ভাড়া ভাতা মাসিক বেতনের সঙ্গে যোগ হয়ে প্রদান করা হয়
কর্মস্থল পরিবর্তন হলে বাড়ি ভাড়ার হারও পরিবর্তিত হতে পারে
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আয়কর
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতন পেলেও তারা আয়কর আইনের আওতায় সাধারণ করদাতা হিসেবে বিবেচিত হন। তবে শিক্ষকদের জন্য কিছু বিশেষ করছাড় ও সুবিধা রয়েছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের করমুক্ত আয়সীমা
সরকার প্রতি অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করে। সাধারণত
সাধারণ শিক্ষক (পুরুষ): নির্ধারিত করমুক্ত সীমা পর্যন্ত আয় হলে কর দিতে হয় না
নারী শিক্ষক, প্রতিবন্ধী শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা কোটা: করমুক্ত সীমা আরও বেশি
👉 করমুক্ত সীমার নিচে আয় হলে কর দিতে হয় না, তবে অনেক ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক।
করযোগ্য আয়
মূল বেতন
বাড়ি ভাড়া ভাতা
চিকিৎসা ভাতা (নির্ধারিত সীমার বেশি হলে)
অন্যান্য নিয়মিত ভাতা
আয়কর কীভাবে কাটা হয়
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আয়কর সাধারণত দুইভাবে আদায় হয়—
ক) উৎসে কর
মাসিক বেতন থেকে আনুমানিক হিসাব করে কর কেটে রাখা হয়
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট দপ্তর এই কর কেটে নেয়
খ) বার্ষিক রিটার্ন
অর্থবছর শেষে শিক্ষককে নিজ দায়িত্বে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়
উৎসে কাটা কর থাকলে তা রিটার্নে সমন্বয় হয়
আয়কর রিটার্ন কেন গুরুত্বপূর্ণ
অনেক শিক্ষক করমুক্ত আয়সীমার নিচে থাকলেও রিটার্ন দেন, কারণ—
সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে
ব্যাংক লোন, ক্রেডিট কার্ডের জন্য
ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা এড়াতে
সরকারি নির্দেশনা মানতে
কর না দিলে কী সমস্যা হতে পারে
জরিমানা আরোপ
ভবিষ্যতে কর ফাইল খোলার সময় জটিলতা
সরকারি সুবিধা পেতে বাধা
তাই আয় কম হলেও নিয়মিত রিটার্ন দেওয়া নিরাপদ।
বাস্তব উদাহরণ (সহজ হিসাব)
ধরা যাক
মাসিক মোট বেতন (ভাতাসহ): ৩০,০০০ টাকা
বার্ষিক আয়: ৩,৬০,০০০ টাকা
👉 যদি এই আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকে → কর দিতে হবে না
👉 তবে অনেক ক্ষেত্রে শূন্য রিটার্ন দাখিল করতে হবে
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা সরকারি অনুমোদিত স্কেল অনুযায়ী বেতন, বাড়ি ভাড়া, ঈদ ও উৎসব ভাতা, অবসর ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা পান। আয়কর নিয়ম অনুসারে তাদের করযোগ্য আয় নির্ধারিত হয়, যা সঠিকভাবে রিপোর্ট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সব সুবিধা ও নিয়ম বোঝার মাধ্যমে শিক্ষকরা তাদের আর্থিক অধিকার সহজেই ব্যবহার করতে পারেন এবং চাকরিজীবনের প্রতিটি ধাপেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন।
