ঈমানের সবচেয়ে বড় শাখা কোনটি

ঈমান হল একজন মুসলমানের জীবনের ভিত্তি। ঈমানের ওপরই সব ইবাদত, চরিত্র, আচার-আচরণ ও দায়িত্ববোধ দাঁড়িয়ে আছে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) উল্লেখ করেছেন ঈমানের বিভিন্ন শাখা রয়েছে কিছু খুব বড় এবং কিছু ছোট। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট শাখা যেখানে পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো, সেখানে সবচেয়ে বড় শাখা হলো

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলা এবং তা মনের গভীর থেকে বিশ্বাস করা।

ঈমানের সবচেয়ে বড় শাখা কোনটি

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন
ঈমানের সর্বোচ্চ শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।(সহিহ মুসলিম)

এই ঘোষণা শুধু একটি বাক্য নয় এটি পুরো ইসলামী জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকেই মুমিনের ঈমানের যাত্রা শুরু হয় এবং এখানেই তার সমস্ত ইবাদতের ভিত্তি।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থ ও গভীরতা

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ
আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।

এই বাক্যের দুটি মূল অংশ আছে

  1. লা ইলাহা (কোনো সত্য উপাস্য নেই)
    মানুষের ভুল বিশ্বাস, মিথ্যা উপাস্য, অহংকার, ক্ষমতা, সম্পদ, লোকভয়—সবকিছু অস্বীকার করা।

  2. ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ আছেন, তিনিই একমাত্র উপাস্য)
    সব শক্তি, ক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব, ইবাদত সব আল্লাহর জন্য এককভাবে নির্ধারিত।

কেন এটি ঈমানের সর্বোচ্চ শাখা

১. কারণ এটি ঈমানের ভিত্তি

মুসলিম হতে প্রথম এবং মূল শর্ত হলো এই কালিমার বিশ্বাস। কালিমা ছাড়া ঈমান নেই, ইবাদত নেই, ইসলামী জীবন শুরুই হয় না।

২. তাওহিদের ঘোষণাই ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু

সকল নবীর দাওয়াতের মূল বার্তা ছিল একটিই—আল্লাহর একত্ববাদ।
নূহ, ইব্রাহিম, মূসা, ঈসা, মুহাম্মদ (সা.)—সকল নবী একই দাওয়াত দিয়েছেন।

৩. এটি আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়

কালিমা মানে হলো—

  • জীবন আল্লাহর নির্দেশে চলবে

  • হালাল–হারাম আল্লাহ নির্ধারণ করবেন

  • ভয়, আশা, দোয়া, ইবাদত—সবই শুধু আল্লাহর জন্য

৪. এটি আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত

হাদিসে এসেছে—
“যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে এবং তার প্রতি আন্তরিক থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
অর্থাৎ, আমলের মূল গ্রহণযোগ্যতা ঈমানের ওপর নির্ভর করে, আর ঈমানের কেন্দ্র হলো তাওহিদ।

৫. এটি হৃদয়কে পবিত্র করে

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মানুষকে—

  • অহংকারমুক্ত করে

  • ভয় ও দুশ্চিন্তা কমায়

  • আল্লাহর ওপর ভরসাকে শক্ত করে

  • ভুল পথ থেকে বাঁচায়

কালিমা বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন

অনেকেই মনে করেন শুধু মুখে বলা হলেই হলো। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে

কালিমার তিনটি স্তম্ভ আছে

  1. হৃদয়ে দৃঢ় বিশ্বাস

  2. মুখে স্বীকার করা

  3. কর্মে প্রমাণ করা

যদি কেউ মুখে বলে কিন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্য শক্তির ওপর ভরসা করে, বা অন্যকে উপাস্য বানায়—তাহলে সে পূর্ণ তাওহিদ অর্জন করছে না।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ জীবনে যে পরিবর্তন আনে

১. জীবন পরিচালনার দিক বদলে দেয়

এটি বিশ্বাস করলে মানুষ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে।

২. নিয়তকে খাঁটি করে তোলে

প্রতিটি কাজ শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করার মানসিকতা তৈরি হয়।

৩. মানুষকে বিনয়ী করে

কারণ সে বুঝে—
ক্ষমতা, সম্পদ, সম্মান—সবই আল্লাহর দান।

৪. ভয় ও দুঃশ্চিন্তা কমিয়ে দেয়

যে বিশ্বাস করে আল্লাহ ছাড়া কেউ ক্ষতি–উপকার দিতে পারে না, তার মনে শান্তি আসে।

হাদিসে ‘কালিমা’র ফজিলত

  • “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সবচেয়ে উত্তম জিকির।

  • মৃত্যুর আগে যার জিহ্বায় এই কালিমা থাকবে, তার জান্নাত লাভ সহজ হবে।

  • মুমিনের হৃদয় আল্লাহর দিকে একান্তভাবে ঝুঁকে যায়।

এগুলো প্রমাণ করে কেন এটিকে ঈমানের সর্বোচ্চ শাখা বলা হয়েছে।

আধুনিক জীবনে তাওহিদের বাস্তব প্রয়োগ

আজকের সমাজে তাওহিদের শিক্ষা মানে—

  • অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, তাবিজ–কবজ থেকে দূরে থাকা

  • ক্ষমতা বা সম্পদকে “উপাস্য” বানানো থেকে বাঁচা

  • আল্লাহর নির্দেশ ছাড়াই নিজের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ মনে না করা

  • ন্যায়–অন্যায়ের বিচার আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী করা

  • সংকটে শুধু আল্লাহর সাহায্য কামনা করা

এগুলোই তাওহিদের বাস্তব অভিব্যক্তি।

ঈমানের সর্বোচ্চ শাখা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”—এটি শুধু একটি বাক্য নয়, বরং সম্পূর্ণ ইসলামী জীবনব্যবস্থার ভিত্তি। এখানে আছে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা, একত্ববাদ, ভরসা, আনুগত্য ও ভালোবাসা। একজন মুসলমানের পূর্ণ ঈমান, ইবাদত এবং চরিত্র তখনই পরিপূর্ণ হয় যখন সে এই কালিমার গভীরতা হৃদয়ে ধারণ করে এবং তার ওপর জীবন পরিচালনা করে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url