ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার পার্থক্য কি
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অসুস্থতার একটি বড় অংশের জন্য দায়ী হলো অণুজীব। এদের মধ্যে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সবচেয়ে পরিচিত নাম। জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া থেকে শুরু করে মারাত্মক সংক্রামক রোগ—সব ক্ষেত্রেই এদের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া একই জিনিস, যা সম্পূর্ণ ভুল। বাস্তবে গঠন, কার্যপ্রণালি, বংশবিস্তার এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার দিক থেকে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য জানা স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভাইরাস কি
ভাইরাস হলো অতি ক্ষুদ্র সংক্রামক কণা, যাকে জীব ও অজীবের মাঝামাঝি বলা হয়। কারণ ভাইরাসের নিজস্ব কোনো কোষীয় গঠন নেই এবং এটি একা বেঁচে থাকতে পারে না। ভাইরাসকে বংশবিস্তার করতে হলে অবশ্যই কোনো জীবিত কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। কোষে ঢুকে ভাইরাস নিজের জিনগত উপাদান ব্যবহার করে নতুন ভাইরাস তৈরি করে।
ভাইরাস সাধারণত DNA অথবা RNA দিয়ে তৈরি হয়, যা একটি প্রোটিন আবরণে আবদ্ধ থাকে। কিছু ভাইরাসের বাইরের দিকে চর্বিযুক্ত আবরণও থাকে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—করোনাভাইরাস, ডেঙ্গু ভাইরাস, এইচআইভি, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ইত্যাদি।
ব্যাকটেরিয়া কি
ব্যাকটেরিয়া হলো এককোষী অণুজীব, যাদের সম্পূর্ণ কোষীয় গঠন রয়েছে। ব্যাকটেরিয়া নিজে নিজেই বেঁচে থাকতে পারে এবং অনুকূল পরিবেশে দ্রুত বংশবিস্তার করতে সক্ষম। এরা সাধারণত দ্বিখণ্ডন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৃদ্ধি পায়।
সব ব্যাকটেরিয়া ক্ষতিকর নয়। বরং আমাদের শরীরে থাকা অনেক ব্যাকটেরিয়া হজমে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
উদাহরণ ল্যাক্টোব্যাসিলাস (উপকারী), ই. কোলাই (কিছু উপকারী, কিছু ক্ষতিকর), সালমোনেলা (ক্ষতিকর)।
ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার পার্থক্য কি
ভাইরাসের কোনো কোষপ্রাচীর, সাইটোপ্লাজম বা নিউক্লিয়াস নেই। অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর, কোষঝিল্লি, সাইটোপ্লাজম ও জিনগত উপাদান থাকে। এই কারণেই ব্যাকটেরিয়াকে পূর্ণাঙ্গ জীব হিসেবে ধরা হয়, কিন্তু ভাইরাসকে নয়।
আকার ও দৃশ্যমানতার পার্থক্য
ভাইরাস আকারে অত্যন্ত ছোট—ব্যাকটেরিয়ার তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ১০০ গুণ ছোট। সাধারণ আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া দেখা যায়, কিন্তু ভাইরাস দেখতে হলে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ প্রয়োজন।
বংশবিস্তার পদ্ধতির পার্থক্য
ভাইরাস নিজে নিজে বংশবিস্তার করতে পারে না। এটি জীবিত কোষে ঢুকে সেই কোষের ভেতরের উপাদান ব্যবহার করে নিজের অনুলিপি তৈরি করে।
অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়া কোনো বাহ্যিক কোষ ছাড়াই নিজে নিজেই বিভাজনের মাধ্যমে বংশবিস্তার করতে পারে।
রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে পার্থক্য
ভাইরাসজনিত রোগ সাধারণত দ্রুত ছড়ায় এবং অনেক সময় মহামারি আকার ধারণ করে। যেমন—কোভিড-১৯, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া।
ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের মধ্যে রয়েছে যক্ষা, টাইফয়েড, কলেরা, নিউমোনিয়া ইত্যাদি।
চিকিৎসা ব্যবস্থার পার্থক্য
ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত টিকা, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নির্ভর করা হয়।
ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর, তবে সঠিক মাত্রা ও সময় মেনে না চললে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হতে পারে।
উপকারিতা ও ক্ষতিকর দিক
ভাইরাস সাধারণত ক্ষতিকর হলেও গবেষণাগারে কিছু ভাইরাস জিন থেরাপি ও চিকিৎসা গবেষণায় ব্যবহৃত হয়।
ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে উপকারিতার দিক অনেক বেশি—দই তৈরি, হজম প্রক্রিয়া, মাটি উর্বর করা, এমনকি ওষুধ তৈরিতেও ব্যাকটেরিয়া ব্যবহৃত হয়।
সবশেষে বলা যায়, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া উভয়ই অণুজীব হলেও তাদের মধ্যে পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্ট। ভাইরাস বেঁচে থাকার জন্য সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, আর ব্যাকটেরিয়া স্বনির্ভর জীব। সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য এই পার্থক্য জানা অত্যন্ত জরুরি। ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় মানুষ অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই সচেতন হওয়াই সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধ।