আক্কেল দাঁত ব্যথা কতদিন থাকে | আক্কেল দাঁত ওঠার লক্ষণ ও ওষুধ

আক্কেল দাঁত বা Wisdom Tooth হলো মানুষের মুখের সর্বশেষ দাঁত, যা সাধারণত কৈশোরের শেষ ভাগ বা তরুণ বয়সে ওঠে। অনেকের ক্ষেত্রে এই দাঁত ওঠা স্বাভাবিক হলেও, বেশিরভাগ সময়ই এটি ব্যথা, ফোলা, সংক্রমণ ও নানা জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যখন দাঁতটি সঠিকভাবে উঠতে পারে না বা মাড়ির ভেতরে আটকে থাকে, তখন তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়।

এই আর্টিকেলে আক্কেল দাঁত ব্যথা কমানোর ওষুধ, কতদিন ব্যথা থাকে, ঘরোয়া উপায়, ওঠার লক্ষণ, বয়স, তোলার খরচ এবং তোলার পর করণীয় সবকিছু বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

আক্কেল দাঁত ব্যথা কতদিন থাকে | আক্কেল দাঁত ওঠার লক্ষণ ও ওষুধ

আক্কেল দাঁত কি

আক্কেল দাঁতকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে তৃতীয় মোলার (Third Molar) বলা হয়। এটি সাধারণত মুখের একেবারে পেছনে ওঠে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মুখে সাধারণত চারটি আক্কেল দাঁত থাকতে পারে—উপরের চোয়ালে দুটি এবং নিচের চোয়ালে দুটি।

আক্কেল দাঁত ওঠার বয়স

সাধারণত ১৭ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে আক্কেল দাঁত ওঠে। তবে কারও ক্ষেত্রে এটি ৩০ বছর পর্যন্তও উঠতে পারে, আবার অনেকের কখনোই ওঠে না।

আক্কেল দাঁত ওঠার লক্ষণ

আক্কেল দাঁত ওঠার সময় নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:

  • মাড়িতে ব্যথা ও ফোলা

  • মুখ পুরোপুরি খুলতে কষ্ট হওয়া

  • চোয়ালে চাপ অনুভব করা

  • মাথাব্যথা

  • কান পর্যন্ত ব্যথা ছড়ানো

  • মাড়ি লাল হয়ে যাওয়া

  • দুর্গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস

যদি দাঁত আংশিকভাবে ওঠে, তবে সেখানে খাবার জমে সংক্রমণ (Pericoronitis) হতে পারে।

আক্কেল দাঁত ব্যথা কতদিন থাকে

আক্কেল দাঁতের ব্যথা সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে যদি দাঁতটি মাড়ির ভেতরে আটকে থাকে (Impacted Tooth), তাহলে ব্যথা কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত চলতে পারে। সংক্রমণ হলে ব্যথা আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

আক্কেল দাঁত ব্যথা কমানোর ওষুধ

⚠️ যেকোনো ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সাধারণত যেসব ওষুধ ব্যবহৃত হয়:

  • প্যারাসিটামল

  • আইবুপ্রোফেন

  • ডাইক্লোফেনাক

  • অ্যান্টিবায়োটিক (সংক্রমণ হলে)

ডেন্টিস্ট প্রয়োজনে ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করেন।

আক্কেল দাঁত ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়

আক্কেল দাঁত (Wisdom Tooth) উঠার সময় অনেকেরই তীব্র ব্যথা, মাড়ি ফুলে যাওয়া, মুখ ঠিকমতো না খুলতে পারা বা মাথা ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে দাঁতটি আংশিক বের হলে সেখানে খাবার আটকে সংক্রমণ হতে পারে। নিচে আক্কেল দাঁত ব্যথা কমানোর কার্যকর ঘরোয়া উপায়গুলো বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো।

লবণ পানি দিয়ে কুলকুচি

গরম হালকা লবণ পানি মাড়ির প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে আধা চা চামচ লবণ মিশিয়ে দিনে ৩–৪ বার কুলকুচি করুন।
এটি ব্যাকটেরিয়া কমায় এবং ফোলা কমাতে সাহায্য করে।

বরফ সেক (Cold Compress)

গালের বাইরে যেখানে ব্যথা, সেখানে বরফ কাপড়ে মুড়ে ১০–১৫ মিনিট ধরে সেক দিন।
এতে ফোলা কমে এবং সাময়িকভাবে ব্যথা অবশ হয়ে যায়।
দিনে কয়েকবার করা যায়।

লবঙ্গ বা লবঙ্গ তেল

লবঙ্গে প্রাকৃতিক ব্যথানাশক উপাদান (Eugenol) থাকে।
একটি লবঙ্গ ব্যথার স্থানে হালকা চিবিয়ে রাখুন অথবা তুলায় সামান্য লবঙ্গ তেল নিয়ে মাড়িতে লাগান।
এটি দ্রুত ব্যথা উপশমে সহায়ক।

রসুন পেস্ট

রসুনে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান আছে।
এক কোয়া রসুন পিষে সামান্য লবণ মিশিয়ে ব্যথার স্থানে লাগাতে পারেন।
এতে সংক্রমণ কমতে সাহায্য করে।

পেঁয়াজ চিবানো

কাঁচা পেঁয়াজে অ্যান্টিসেপ্টিক গুণ রয়েছে।
ছোট টুকরো পেঁয়াজ ব্যথার পাশে হালকা চিবালে জীবাণু কমে এবং ব্যথা কিছুটা কমে।

পুদিনা পাতা বা টি ব্যাগ

পুদিনা পাতা বেটে লাগানো যায়।
ব্যবহৃত গ্রিন টি বা ব্ল্যাক টি ব্যাগ ফ্রিজে ঠান্ডা করে মাড়িতে ধরে রাখলে ফোলা ও ব্যথা কমে।

মুখ পরিষ্কার রাখা

আক্কেল দাঁতের আশেপাশে খাবার আটকে গেলে সংক্রমণ বাড়ে।
নরম ব্রাশ দিয়ে আস্তে করে পরিষ্কার করুন।
প্রয়োজনে মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন।

আক্কেল দাঁতের ব্যথা সাধারণ হলেও অবহেলা করা ঠিক নয়। ঘরোয়া উপায়ে সাময়িক আরাম মিললেও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার ক্ষেত্রে অবশ্যই দাঁতের ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক পরিচর্যা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেই বেশিরভাগ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

আক্কেল দাঁত তুললে কি সমস্যা হয়

সাধারণত আক্কেল দাঁত তোলা নিরাপদ একটি প্রক্রিয়া। তবে কিছু সাময়িক সমস্যা হতে পারে:

  • ২–৫ দিন ফোলা

  • হালকা রক্তপাত

  • ব্যথা

  • মুখ খুলতে কষ্ট

খুব কম ক্ষেত্রে “Dry Socket” নামক জটিলতা হতে পারে, যেখানে দাঁত তোলার স্থানে রক্ত জমাট না বাঁধলে তীব্র ব্যথা হয়।

আক্কেল দাঁত তোলার খরচ কত

বাংলাদেশে আক্কেল দাঁত তোলার খরচ নির্ভর করে দাঁতের অবস্থার ওপর।

  • সাধারণ দাঁত তোলা: ২,০০০ – ৫,০০০ টাকা

  • সার্জিক্যাল এক্সট্রাকশন (কাটা-ছেঁড়া): ৫,০০০ – ১৫,০০০ টাকা বা তার বেশি

সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে করা যায়।

আক্কেল দাঁত তোলার পর করণীয়

দাঁত তোলার পর সঠিক যত্ন না নিলে সংক্রমণ হতে পারে। তাই নিচের বিষয়গুলো মানা জরুরি:

  • প্রথম ২৪ ঘণ্টা কুলকুচি করবেন না

  • গরম খাবার এড়িয়ে চলুন

  • শক্ত খাবার খাবেন না

  • ধূমপান ও স্ট্র ব্যবহার করবেন না

  • চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত খান

  • বরফ সেক দিন

৩–৭ দিনের মধ্যে সাধারণত ক্ষত শুকিয়ে যায়।

কখন ডেন্টিস্টের কাছে যাবেন?

নিচের লক্ষণ থাকলে দ্রুত ডেন্টিস্ট দেখান:

  • প্রচণ্ড ব্যথা

  • মুখ ফুলে যাওয়া

  • জ্বর

  • পুঁজ বের হওয়া

  • ১ সপ্তাহের বেশি ব্যথা থাকা

আক্কেল দাঁত একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় উঠলেও অনেক সময় এটি তীব্র ব্যথা ও জটিলতার কারণ হতে পারে। সাময়িকভাবে ঘরোয়া উপায়ে ব্যথা কমানো গেলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো। সময়মতো চিকিৎসা নিলে বড় ধরনের সমস্যা এড়ানো সম্ভব।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url