আমরা কি সত্যিই বাংলাভাষী | ভাষা ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের গল্প

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জীবন দেন একদল তরুণ ছাত্র। সেই আত্মত্যাগের ফলেই পরবর্তীতে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায় এবং জাতীয় চেতনার ভিত্তি শক্ত হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে বাংলা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপরিচয়ের অংশ। আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ-এ দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করি আজকের প্রজন্ম কি সেই ত্যাগের মূল্য ঠিকভাবে দিচ্ছে?

আমরা কি সত্যিই বাংলাভাষী | ভাষা ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের গল্প Amra ki Banglabaasi

যদি কেউ বাংলাদেশ এ জন্মগ্রহন করে, বাংলা ভাষায় কথা বলে, বাংলা সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ইতিহাসকে ধারণ করে তাহলে অবশ্যই সে বাংলাবাসী। কিন্তু শুধু জন্ম বা ঠিকানা দিয়ে সব নির্ধারণ হয় না? নিজের ভাষার প্রতি সম্মান, শুদ্ধ ব্যবহার, এবং চর্চাই প্রকৃত পরিচয় গড়ে তোলে।

বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ ইউটিউব, ব্লগ, ফেসবুক, পডকাস্টে বাংলা কনটেন্ট তৈরি করছে। বাংলা গান, সিনেমা, ওয়েব কনটেন্ট সবকিছুতেই নতুন জাগরণ আছে। কিন্তু আমরা প্রায়সময় অকারণে ইংরেজি আরবি, ফার্সি ইত্যাদি মিশ্র ভাষায় কথা বলি বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলার চর্চা কম করা হয়। ভাষার গভীরতা, সাহিত্য, ইতিহাস এসবের প্রতি একদমই আগ্রহ দেখাই না, এর প্রধান কারন হচ্ছে আমরা ভাষাকে ভালোবাসি, কিন্তু সবসময় চর্চা করি না। এই কারনে দুঃখ ভরা মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি সত্যিই বাংলাবাসী? 

আমরা কি সত্যিই বাংলাবাসী

চায়ের কাপে বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়ার সময় হঠাৎ মাথায় আসে—“চা” শব্দটি চীনা, “বিস্কুট” ফরাসি, “চানাচুর” হিন্দি, “চিনি” চীনা, “পানি” হিন্দি, “পেয়ালা” ফারসি, “কাপ” ইংরেজি, “ইংরেজি” আবার পর্তুগিজ উৎসের!

এক কাপ চা খেতেই যদি এত ভাষার ব্যাবহার হয়, তাহলে আমরা আসলে কোন ভাষার মানুষ?

কফি তুর্কি শব্দ, কেক ইংরেজি, পাউরুটি পর্তুগিজ। রেস্তোরাঁ ফরাসি, ব্যুফে ফরাসি, পিৎজা ইতালীয় হলেও শব্দটি ফরাসি ও ইউরোপীয় ভাষায় জনপ্রিয় হয়ে ছড়িয়েছে, মশলা আরবি, মরিচ ফারসি। বার্গার ইংরেজি, চকোলেট এসেছে মেক্সিকান উৎস থেকে। অর্ডার ইংরেজি, মেন্যু ফরাসি, ম্যানেজার ইতালীয়, নগদ আরবি, দারোয়ান ফারসি, বকশিসও ফারসি।

বাজার ফারসি, সবজি ফারসি, রাস্তা ফারসি, আনারস পর্তুগিজ, লিচু চীনা, তরমুজ ফারসি, লেবু তুর্কি, পেয়ারা ও কামরাঙা পর্তুগিজ। ওজন আরবি, আসল আরবি, দাম গ্রিক উৎস থেকে এসেছে।

ধর্মীয় ক্ষেত্রেও একই চিত্র মসজিদ আরবি, দরগাহ ফারসি, গির্জা পর্তুগিজ, পাদ্রী পর্তুগিজ, মন্দির সংস্কৃত হলেও “ঠাকুর” তুর্কি উৎসের বলে ধরা হয়। অফিস ইংরেজি, আদালত আরবি, আইন ফারসি, উকিল আরবি। স্কুল-কলেজ ইংরেজি, কিন্ডারগার্টেন জার্মান, বই/কেতাব আরবি, কাগজ ফারসি, কলম আরবি। তাহলে প্রশ্ন জাগে আমরা কি সত্যিই বাংলাবাসী

১৯৫২ সালের সংগ্রাম তাহলে লাভ কী

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান-এ ছাত্ররা বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে রক্ত দেন। সেই আন্দোলনই পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদের ভিত গড়ে দেয় এবং জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশ-এর।

তারা কি “খাঁটি বাংলা” রক্ষার জন্য লড়েছিলেন?
না। তারা লড়েছিলেন নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য।

তারা লড়েছিলেন যেন রাষ্ট্র, শিক্ষা, প্রশাসন মানুষের মাতৃভাষাকে অস্বীকার না করে।

আজকের প্রজন্ম কি সেই ত্যাগের মূল্য দিচ্ছে

অনেকে বলেন—না। কারণ

  • অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি মেশানো

  • বানান ভুল

  • রোমান হরফে বাংলা লেখা

  • বাংলা সাহিত্যের প্রতি অনাগ্রহ

আবার অন্যদিকে বাস্তবতাও আছে
আজকের তরুণরাই ইউটিউব, ব্লগ, পডকাস্টে বিপুল বাংলা কনটেন্ট তৈরি করছে। আন্তর্জাতিকভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পেয়েছে ইউনেস্কো-এর মাধ্যমে। বাংলা এখন বিশ্বমঞ্চে আলোচিত।

সমস্যা ভাষা ধার করা নয়; সমস্যা হলো ভাষার প্রতি উদাসীনতা।

তাহলে আমরা কি বাংলাবাসী

হ্যাঁ, আমরা বাংলাবাসী
কারণ আমরা বাংলায় ভাবি।
বাংলায় কাঁদি।
বাংলায় ভালোবাসি।

আমাদের শব্দের ভাণ্ডার বহু ভাষা থেকে আসুক, কিন্তু বাক্য গঠনের হৃদয়টা বাংলা। আমাদের অনুভূতির ব্যাকরণ বাংলা।

ভাষা কোনো দেয়াল নয়; ভাষা সেতু।
বাংলা সেই সেতু, যেখানে চীনা “চা”, আরবি “মন”, ফারসি “বাজার”, ইংরেজি “স্কুল”—সব একসাথে দাঁড়িয়ে আছে।

আমরা বাংলাবাসী কিনা, সেটি শব্দের উৎস দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
নির্ধারিত হয় আমরা কি আমাদের ভাষাকে সম্মান করি?
আমরা কি শুদ্ধভাবে লিখতে চেষ্টা করি?
আমরা কি আগামী প্রজন্মকে ভাষার ইতিহাস শেখাই?

বাংলা কোনো একক উৎসের ভাষা নয়; এটি সভ্যতার সংলাপ।
আর সেই সংলাপের অংশ বলেই আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url