কুকুর আচর দিলে কি করতে হবে | কুকুর আচর দিলে কি হয়

বর্তমানে গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই কুকুরের সংখ্যা বেড়েছে। অনেক সময় হঠাৎ করে কুকুর আচর (নখের আঁচড়) দিয়ে দেয়। অনেকেই ভাবেন, কামড় না দিলে হয়তো তেমন সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তবে কুকুরের আচর থেকেও সংক্রমণ হতে পারে, বিশেষ করে যদি কুকুরটি রেবিস আক্রান্ত হয়।

রেবিস একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা চিকিৎসা না করলে প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই কুকুর আচর দিলে অবহেলা না করে দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

কুকুর আচর দিলে কি করতে হবে | কুকুর আচর দিলে কি হয়

কুকুর আচর দিলে কি হয়

কুকুর আচর দিলে নিম্নলিখিত সমস্যা হতে পারে

সংক্রমণ (Infection)

কুকুরের নখে ময়লা, জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এতে ত্বকে ক্ষত তৈরি হলে সংক্রমণ, ফোলা, লালচে ভাব বা পুঁজ হতে পারে।

রেবিসের ঝুঁকি

রেবিস ভাইরাস সাধারণত লালা (saliva) মাধ্যমে ছড়ায়। যদি কুকুর নিজের শরীর চাটে এবং নখে ভাইরাস লেগে থাকে, তাহলে আঁচড়ের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

Rabies একটি প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী রোগ, যদি উপসর্গ শুরু হয়ে যায়।

টিটেনাসের ঝুঁকি

গভীর ক্ষত হলে টিটেনাসের ঝুঁকিও থাকে। তাই টিটেনাস টিকা আপডেট আছে কিনা তা জানা জরুরি।

কুকুর আচর দিলে কি করতে হবে

কুকুর আচর (scratch) দিলে অনেকেই এটাকে হালকা মনে করেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কুকুরের নখে লালা বা মাটি লাগা থাকতে পারে, যা থেকে রেবিসসহ (জলাতঙ্ক) মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে। তাই দ্রুত ও সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া খুবই জরুরি।

নিচে ধাপে ধাপে কী করবেন তা বিস্তারিত দেওয়া হলো

সাথে সাথে ক্ষত ধুয়ে ফেলুন

ক্ষতস্থানে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ধরে প্রবাহমান পানি ও সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
এতে ভাইরাস থাকলে তার পরিমাণ অনেক কমে যায়।
ক্ষত যত গভীরই হোক, ধোয়া বন্ধ করবেন না।

অ্যান্টিসেপ্টিক ব্যবহার করুন

ধোয়ার পর পভিডোন আয়োডিন (Betadine) বা অন্য অ্যান্টিসেপ্টিক লাগান।
এতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।

ক্ষত ঢেকে রাখুন (প্রয়োজনে)

হালকা পরিষ্কার গজ দিয়ে ঢেকে রাখতে পারেন।
তবে খুব শক্ত করে বাঁধবেন না।

দ্রুত ডাক্তারের কাছে যান

কুকুর আচর দিলে রেবিসের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি।
বিশেষ করে যদি—

  • কুকুরটি অচেনা বা রাস্তার হয়

  • টিকা নেওয়া আছে কিনা জানা না থাকে

  • ত্বক কেটে রক্ত বের হয়

  • আচর গভীর হয়

রেবিস ভ্যাকসিন নিতে হতে পারে

ডাক্তার পরিস্থিতি দেখে রেবিস ভ্যাকসিন (Post-Exposure Prophylaxis) দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন।
রেবিস একবার লক্ষণ শুরু হলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী, তাই দেরি করা যাবে না।

টিটেনাস ইনজেকশন দরকার হতে পারে

যদি গত ৫–১০ বছরের মধ্যে টিটেনাস টিকা না নেওয়া থাকে, তাহলে টিটেনাস ইনজেকশন নিতে হতে পারে।

কোন ভুলগুলো করবেন না

ক্ষতে মরিচ, হলুদ, মাটি বা অন্য কিছু লাগাবেন না।
ক্ষত পুড়িয়ে ফেলবেন না।
“কিছু হবে না” ভেবে অবহেলা করবেন না।

কখন ঝুঁকি বেশি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা World Health Organization অনুযায়ী, কুকুরের কামড় বা আঁচড় যদি ত্বক ভেদ করে, তাহলে তা রেবিস সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে রেবিসের ঝুঁকি বেশি।

কুকুর আচর ছোট মনে হলেও অবহেলা করা উচিত নয়। সাথে সাথে সাবান-পানি দিয়ে ধোয়া এবং দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

কুকুরটি পোষা নাকি রাস্তার

পোষা কুকুর হলে

  • কুকুরটির টিকা দেওয়া আছে কিনা নিশ্চিত করুন

  • ১০ দিন পর্যবেক্ষণে রাখুন

  • অসুস্থতার লক্ষণ দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন

রাস্তার কুকুর হলে

  • ধরে নিন ঝুঁকি আছে

  • দেরি না করে টিকা শুরু করুন

রেবিসের লক্ষণ কি

রেবিসের লক্ষণ সাধারণত কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পরে দেখা দিতে পারে। যেমন—

  • জ্বর

  • মাথাব্যথা

  • পানি দেখলে ভয় (Hydrophobia)

  • অস্থিরতা

  • খিঁচুনি

একবার উপসর্গ শুরু হলে রোগটি প্রায় নিরাময় অযোগ্য। তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়।

কখন টিকা জরুরি

নিচের পরিস্থিতিতে অবশ্যই রেবিস টিকা নিতে হবে—

  • ত্বক ফেটে রক্ত বের হলে

  • গভীর আঁচড় হলে

  • কুকুরটি অসুস্থ বা অজানা হলে

  • ক্ষত মুখ, গলা বা মাথায় হলে

হালকা আঁচড় হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কি করবেন

শিশুরা প্রায়ই বিষয়টি লুকিয়ে রাখে। তাই—

  • শরীরে কোনো অস্বাভাবিক দাগ দেখলে জিজ্ঞাসা করুন

  • সাথে সাথে ক্ষত ধুয়ে ফেলুন

  • দেরি না করে চিকিৎসা নিন

শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি, তাই সচেতনতা জরুরি।

কুকুর আচর প্রতিরোধের উপায়

  • অচেনা কুকুরের কাছাকাছি না যাওয়া

  • কুকুরকে উত্তেজিত না করা

  • পোষা কুকুরকে নিয়মিত টিকা দেওয়া

  • শিশুদের সচেতন করা

কুকুর আচরকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। অনেকেই মনে করেন কামড় না দিলে সমস্যা নেই, কিন্তু বাস্তবে আঁচড় থেকেও সংক্রমণ ও রেবিসের ঝুঁকি থাকতে পারে।

সঠিক সময়ে সাবান-পানি দিয়ে ধোয়া, অ্যান্টিসেপ্টিক ব্যবহার এবং দ্রুত রেবিস টিকা নেওয়া জীবন বাঁচাতে পারে। মনে রাখবেন রেবিস একবার শুরু হলে প্রায় নিরাময় অসম্ভব, কিন্তু সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এটি পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। সতর্ক থাকুন, সচেতন থাকুন এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নিন।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url