পলিসিস্টিক ওভারি ভালো হলে কি বাচ্চা হবে
পলিসিস্টিক ওভারি বা PCOS বর্তমানে নারীদের একটি সাধারণ হরমোনজনিত সমস্যা। অনেকেই জানতে চান পলিসিস্টিক ওভারি ভালো হলে কি বাচ্চা হবে? এই সমস্যার কারণে মাসিক অনিয়ম, ওভারি বড় হয়ে যাওয়া, ওজন বৃদ্ধি এবং সন্তান ধারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে সঠিক চিকিৎসা, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুস্থভাবে গর্ভধারণ সম্ভব। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো ওভারিয়ান সিস্ট কী, কেন হয়, ওভারি বড় হলে কী হয় এবং চিকিৎসা পদ্ধতি।
ওভারিয়ান সিস্ট কি
ওভারিয়ান সিস্ট হলো ডিম্বাশয়ে (ovary) তরলভর্তি ছোট থলির মতো গঠন। সাধারণত মাসিক চক্রের সময় স্বাভাবিকভাবেই ছোট সিস্ট তৈরি হয় এবং তা নিজে নিজেই সেরে যায়।
কিন্তু যখন একাধিক ছোট সিস্ট একসাথে তৈরি হয় এবং ডিম্বাশয় বড় হয়ে যায়, তখন তাকে পলিসিস্টিক ওভারি বলা হয়। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে Polycystic Ovary Syndrome বলা হয়।
পলিসিস্টিক ওভারি কেন হয়
পলিসিস্টিক ওভারি মূলত হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে হয়। প্রধান কারণগুলো হলোঃ
হরমোনের অসামঞ্জস্য
শরীরে অ্যান্ড্রোজেন (পুরুষ হরমোন) বেড়ে গেলে ডিম্বাণু সঠিকভাবে পরিপক্ক হতে পারে না।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা থাকলে শরীর ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এতে ওজন বৃদ্ধি ও PCOS বেড়ে যায়।
জেনেটিক কারণ
পরিবারে কারও এই সমস্যা থাকলে অন্য সদস্যদের ঝুঁকি বেশি থাকে।
অতিরিক্ত ওজন
স্থূলতা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং ওভারি সিস্টের ঝুঁকি বাড়ায়।
ওভারি বড় হওয়ার কারণ কি
ওভারি বড় হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমনঃ
পলিসিস্টিক ওভারি
হরমোনের সমস্যা
থাইরয়েডের অসুখ
ইনফেকশন
সিস্ট বা টিউমার
যখন ডিম্বাশয়ে একাধিক অপরিপক্ক ডিম্বাণু জমা হয়, তখন তা বড় হয়ে যায় এবং আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে ধরা পড়ে।
ওভারি বড় হলে কি বাচ্চা হয়
এটি অনেকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
হ্যাঁ, ওভারি বড় হলেও বাচ্চা হওয়া সম্ভব যদি সঠিক চিকিৎসা নেওয়া হয়।
পলিসিস্টিক ওভারি থাকলে অনেক সময় নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন (ovulation) হয় না। ফলে গর্ভধারণে দেরি হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অধিকাংশ নারী স্বাভাবিকভাবে মা হতে পারেন।
যদি পলিসিস্টিক ওভারি ভালো হয়ে যায় বা নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
ওভারি সিস্ট দূর করার ঔষধ
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিচের ধরনের ওষুধ দেওয়া হতে পারে—
হরমোনাল পিল
মাসিক নিয়মিত করতে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহার করা হয়।
ওভুলেশন ইনডাকশন ঔষধ
যারা বাচ্চা নিতে চান, তাদের জন্য ডিম্বস্ফোটন বাড়ানোর ওষুধ দেওয়া হয়।
ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণের ওষুধ
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে নির্দিষ্ট ওষুধ দেওয়া হয়।
⚠️ সতর্কতা: নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক। অবশ্যই গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।
ওভারি সিস্ট দূর করার ঘরোয়া উপায়
ঘরোয়া পদ্ধতি পুরোপুরি সিস্ট সারায় না, তবে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ
মাত্র ৫-১০% ওজন কমালেও হরমোনের ভারসাম্য অনেকটা ঠিক হয়।
নিয়মিত ব্যায়াম
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন।
স্বাস্থ্যকর খাবার
কম কার্বোহাইড্রেট, বেশি শাকসবজি ও প্রোটিন গ্রহণ করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম
৭–৮ ঘণ্টা ঘুম হরমোন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
মানসিক চাপ কমানো
অতিরিক্ত স্ট্রেস হরমোনের সমস্যা বাড়ায়।
পলিসিস্টিক ওভারি ভালো হলে কি বাচ্চা হবে
হ্যাঁ, পলিসিস্টিক ওভারি ভালো হলে বা নিয়ন্ত্রণে থাকলে বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসায় PCOS থাকা নারীদের মধ্যেও অধিকাংশই সফলভাবে গর্ভধারণ করছেন।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত চেকআপ থাকলে মা হওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব।
পলিসিস্টিক ওভারি কোনো আজীবন অমোচনীয় রোগ নয়। এটি একটি হরমোনজনিত সমস্যা যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হোন, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন। মনে রাখবেন সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে সুস্থ মা হওয়া সম্ভব।
